নিজস্ব প্রতিবেদক।
উদ্বোধনের পর কেটে গেছে কয়েক বছর। সরকারি নথিতে ১৭টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার পেয়েছে মাথা গোঁজার ঠাঁই। কিন্তু বাস্তবে সেখানে নেই কোনো মানুষের কোলাহল। মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার বরাইদ ইউনিয়নের খলিশাডহুরা এলাকায় নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর ১৭টি ঘরের সবকয়টিই এখন তালাবদ্ধ। সঠিক তদারকি ও যাচাই-বাছাইয়ের অভাবে সরকারের এই মানবিক উদ্যোগটি এখন স্থবির হয়ে পড়েছে, আর বঞ্চিত রয়ে গেছে স্থানীয় প্রকৃত ভূমিহীন পরিবারগুলো।
আশ্রয়ণ এখন জঙ্গল আর আবর্জনার স্তূপ:
সরেজমিনে রোববার দুপুরে সাটুরিয়া উপজেলা সদর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে খলিশাডহুরা আশ্রয়ণ প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায় এক ভুতুড়ে পরিবেশ। যাতায়াতের রাস্তা, বিদ্যুৎ ও পানির সুব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পের ১৭টি ঘরের একটিতেও কোনো বাসিন্দা নেই। দীর্ঘদিন জনমানবহীন থাকায় ঘরের চারপাশ ঘন জঙ্গলে ছেয়ে গেছে। বারান্দাগুলো পরিণত হয়েছে আবর্জনার স্তূপে। দেখভালের অভাবে কয়েকটি ঘরের দেওয়ালে ইতিমধ্যেই ফাটল ধরতে শুরু করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা শাহানাজ (৪৫) জানান, “মানুষ না থাকায় ফাঁকা ঘরের বারান্দাগুলো এখন এলাকার লোকজন যে যার মতো ব্যবহার করছে। কেউ ট্রাক্টর রাখছে, কেউ মাটি ও গোবর রাখছে, আবার কেউ ভুট্টার গাছ স্তূপ করে রাখছে। এভাবে চলতে থাকলে দ্রুতই ঘরগুলো বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।”
ভুল বরাদ্দের খেসারত, দূরত্ব ১২ কিলোমিটার:
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২০-২০২১ অর্থবছরে মুজিববর্ষ উপলক্ষে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প ‘আশ্রয়ণ-২’ এর আওতায় খলিশাডহুরা এলাকায় প্রতিটি ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা ব্যয়ে এই ১৭টি ঘর নির্মাণ করা হয়। প্রতিটি ঘরে দুটি কক্ষ, একটি রান্নাঘর ও একটি টয়লেট রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প এলাকার আশেপাশে অনেক প্রকৃত ভূমিহীন ও দরিদ্র পরিবার থাকা সত্ত্বেও তাদের ঘর দেওয়া হয়নি। যাদের নামে ঘর বরাদ্দ হয়েছে, তারা প্রকল্প এলাকা থেকে ১২কিলোমিটার দূরে বালিয়াটি ইউনিয়নের বালিয়াটি, হাজীপুর ও খলিলাবাদ গ্রামের বাসিন্দা।
দূরত্বের কারণে বিপাকে পড়া কয়েকজন বরাদ্দপ্রাপ্ত নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তারা মূলত বালিয়াটি এলাকায় দিনমজুর বা ছোটখাটো ব্যবসা করেন। প্রতিদিন জীবিকার তাগিদে ১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে খলিশাডহুরায় এসে থাকা এবং আবার বালিয়াটিতে গিয়ে কাজ করা তাদের পক্ষে আর্থিকভাবে ও শারীরিকভাবে অসম্ভব। ফলে ঘর পেয়েও তারা সেখানে উঠতে পারছেন না।
পেছনে কি অন্য কোনো সমীকরণ?
এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে, বরাদ্দপ্রাপ্তদের অনেকেই মূলত জমি ও ঘর পাওয়ার পর তা চড়া দামে বিক্রি করার দূরভিসন্ধি নিয়েছিলেন। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তারা এই বরাদ্দ বাগিয়ে নেন। কিন্তু সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আশ্রয়ণের ঘর ও জমি হস্তান্তর বা বিক্রি করা নিষিদ্ধ হওয়ায়, তারা তা বিক্রি করতে ব্যর্থ হন। ফলে ঘরগুলো এভাবেই পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. রমজান আলী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আশ্রয়ণের ঘরগুলো এখন স্রেফ জঙ্গল হয়ে আছে। আমাদের এলাকায় অনেক প্রকৃত ভূমিহীন মানুষ রয়েছে যারা ভাঙা ঘরে বা অন্যের জায়গায় কষ্ট করে থাকছে। ঘরগুলো তাদের নামে পুনরায় বরাদ্দ দেওয়ার জন্য আমি কয়েকবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত আবেদন করেছি, কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এখনো কোনো সুরাহা হয়নি।”
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:
সাটুরিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা খলিলুর রহমান মোল্লাহ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “আমি নিজে খলিশাডহুরা এলাকার আশ্রয়ণ প্রকল্পটি পরিদর্শন করেছি। সেখানে ১৭টি ঘরের সবকয়টিই তালাবদ্ধ পাওয়া গেছে, কোনো মানুষ সেখানে থাকে না।”
এ বিষয়ে সাটুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী মোহাম্মদ অনিক ইসলাম বলেন, “আইনি কিছু জটিলতার কারণে আমরা চাইলেই দ্রুত অন্য কাউকে ঘরগুলো দিতে পারছি না। বরাদ্দপ্রাপ্তদের যে দলিল করে দেওয়া হয়েছে, তা আইনগতভাবে বাতিল না করা পর্যন্ত অন্য কাউকে পুনরায় বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব নয়। তবে আমরা বসে নেই। যারা ঘরগুলো ফেলে রেখেছেন, তাদের কেন সরকারি সম্পত্তি অপচয়ের দায়ে অভিযুক্ত করা হবে না—তা জানতে চেয়ে দ্রুতই নোটিশ পাঠানো হবে। নোটিশের জবাব ও আইনানুযায়ী দলিল বাতিলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রকৃত ভূমিহীনদের মাঝে ঘরগুলো পুনর্বণ্টন করা হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এই মানবিক প্রকল্পটিকে এভাবে নষ্ট হতে দেওয়া যায় না। দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে এলাকার প্রকৃত গৃহহীনদের এই ঘরে থাকার ব্যবস্থা করা হোক।