মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি।
মানিকগঞ্জের সিংগাইর অটোরিকশা চালক কিশোর সাকিবুল (১৬) হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ঘটনার মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে পিবিআই মানিকগঞ্জ জেলা শাখা নিবিড় তদন্ত ও তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় মূল হত্যাকারী আসাদুজ্জামান আসাদকে (৩৪) সাভারের হেমায়েতপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। প্রেফার আসামি অটোরিকশা ছিনতাই ও ব্যক্তিগত আক্রোশের জেরে সাকিবুলকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে।বিষয়টি বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে মানিকগঞ্জ পিবিআই অফিসে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নিশ্চিত করেছে।
গ্রেফতারকূত আসাদ মানিকগঞ্জ সদরের গোলাই নতুনপাড়া (বরুন্ডি) এলাকার মৃত হাফেজ মোঃ ইদ্রিস আলীর ছেলে। সে সাভারের একটি হোটেলে সহকারী ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিল।
মামলার বিবরণ ও পিবিআই সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ জুন ২০২৬ তারিখ বিকেল আনুমানিক ৩ টার দিকে সিংগাইর থানার গোবিন্দপুর মিত্রা গ্রামের রহমত আলীর ছেলে সাকিবুল তার বাবার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী পরিবহনের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়। এরপর সে আর বাড়ি ফিরে আসেনি। পরিবারের সদস্যরা তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে সেটিও বন্ধ পাওয়া যায়। পরদিন ১ জুলাই ২০২৬ তারিখ ভোর আনুমানিক ৫টার দিকে সিংগাইর থানাধীন জামশা ইউনিয়নের গোলাই নতুনপাড়া এলাকার একটি পাটক্ষেত থেকে সাকিবুলের মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় ২ জুলাই সিংগাইর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়, যার তদন্তভার পরবর্তীতে পিবিআই গ্রহণ করে।
পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোস্তফা কামালের তত্ত্বাবধান ও দিক-নির্দেশনায় এবং পিবিআই মানিকগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার জয়িতা শিল্পী, পিপিএম-এর সার্বিক সহযোগিতায় তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই (নিঃ) মোঃ রবিউল ইসলাম ঘটনার ছায়া তদন্ত শুরু করেন। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং ছদ্মবেশে গোপন অনুসন্ধানের মাধ্যমে আসামির পরিচয় নিশ্চিত করে গত ৮ জুলাই বিকাল ৬ টার দিকে সাভারের হেমায়েতপুর মাদরাসা গেট এলাকা থেকে আসামি আসাদুজ্জামান আসাদকে গ্রেফতার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে আসামি আসাদ জানায়, ঘটনার দিন (৩০ জুন) সে হেমায়েতপুর থেকে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। বৃষ্টির কারণে হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ডে আটকা পড়ে একটি ফার্মেসিতে অপেক্ষা করার সময় সে অটোরিকশা ভাড়া করার সিদ্ধান্ত নেয়। সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে ছয় টার দিকে সে সাকিবুলের অটোরিকশাটি গোলাইডাঙ্গা যাওয়ার জন্য ২০০ টাকায় ভাড়া করে। পথিমধ্যে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মধ্যে গোলাই নতুনপাড়া এলাকার কাছাকাছি পৌঁছালে রাস্তার ভাঙাচোরার কারণে অটোরিকশাটি জোরে ঝাঁকুনি খায়। এতে আসাদ ক্ষিপ্ত হয়ে সাকিবুলকে গালমন্দ করে এবং একপর্যায়ে তার ঘাড়ে থাপ্পড় মারে।
এর ফলে অটোরিকশাটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে একটি গাছের সাথে আটকে যায়। তখন সাকিবুল অটোরিকশা থেকে নেমে আসাদকে পাল্টা গালমন্দ করলে আসাদ আরও হিংস্র হয়ে ওঠে। সে সাকিবুলকে এলোপাতাড়ি কিল-থাপ্পড় মারতে থাকে। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে সাকিবুল চিৎকার করার চেষ্টা করলে আসাদ তার মুখ চেপে ধরে মাটিতে কাদার মধ্যে উপুড় করে চেপে ধরে এবং পিঠের ওপর বসে ঘাড়ে কনুই দিয়ে সজোরে চাপ দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সাকিবুল নিস্তেজ হয়ে শ্বাসরোধে মারা যায়। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর আসাদ সাকিবুলের মৃতদেহ পাশের একটি পাটক্ষেতের ভেতরে লুকিয়ে রেখে তার পায়ের স্যান্ডেল ফেলে রেখে দৌঁড়ে পালিয়ে যায়।
পিবিআই জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছিনতাইকৃত অটোরিকশাটি ইতোমধ্যে সিংগাইর থানা পুলিশ হেফাজতে গ্রহণ করেছে এবং আসামির ফেলে যাওয়া স্যান্ডেল আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। আসামি আসাদুজ্জামান আসাদ পিবিআই-এর নিকট এবং বিজ্ঞ আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে। মামলার তদন্ত এবং পরবর্তী আইনি কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে।