নিজস্ব প্রতিবেদক,
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য যখন নারীর বিনিয়োগ ও ক্ষমতায়ন, তখন সাটুরিয়ার এই চার কর্মকর্তা তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাদের এই অদম্য অগ্রযাত্রা প্রমাণ করে যে, সরকারি সেবার হাল যদি দক্ষ নারীর হাতে থাকে, তবে সেই জনপদ সমৃদ্ধ হতে বাধ্য।
অষ্টাদশ শতকের কবি বা বিংশ শতকের বিপ্লবীরা নারীর যে ক্ষমতায়নের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তার এক মূর্ত প্রতীক আজ মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলা। সরকারি প্রশাসনের অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমি, প্রাণিসম্পদ, কৃষি ও মহিলা বিষয়ক এই চারটি দপ্তর পরিচালিত হচ্ছে চার দক্ষ নারী কর্মকর্তার হাত ধরে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসে সাটুরিয়ার এই চার ‘উন্নয়ন সারথি’ হয়ে উঠেছেন উপজেলার লাখো মানুষের আস্থার ঠিকানা।নারীর প্রশাসনিক ক্ষমতায়ন ও জনসেবায় তাদের এই অদম্য অগ্রযাত্রা আসন্ন নারী দিবসে অন্য সকল নারীর জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
“প্রশাসনিক দক্ষতা ও মানবিকতায় সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন তাঁরা।”
১.ডা. তানজিলা ফেরদৌসী: খামারিদের বিপদের বন্ধু
প্রাণিসম্পদ সেবায় সাটুরিয়া এখন অনেক এগিয়ে, যার নেপথ্যে রয়েছেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. তানজিলা ফেরদৌসী। পশুপালন যাদের প্রধান জীবিকা, তাদের জন্য তিনি এক ভরসার নাম। গভীর রাতে কোনো খামারির গরু অসুস্থ হলেও ডা. তানজিলার পরামর্শ বা সেবা পাওয়া যায়—এমন সুনাম ছড়িয়েছে পুরো উপজেলায়। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের হাঁস-মুরগি ও গবাদি পশু পালনে উদ্বুদ্ধ করে তিনি গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করেছেন।

ডা. তানজিলা ফেরদৌসী বলেন, ”একজন নারী যখন নিষ্ঠার সাথে কাজ করেন, তখন সমাজ তাকে কেবল বাধা দেয় না, বরং সম্মান করতেও শেখে। আমার লক্ষ্য হলো সাটুরিয়ার প্রতিটি খামারিকে স্বাবলম্বী করে তোলা।”
২.মৌমিতা গুহ ইভা : সাটুরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তার কর্মদক্ষতা ও সততা দিয়ে ভূমি সেবায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে তাকে নিয়ে এলাকায় বইছে প্রশংসার জোয়ার।
যোগদানের পর থেকেই তিনি সাটুরিয়া ভূমি অফিসকে দালালমুক্ত ও ডিজিটাল সেবায় রূপান্তর করতে আপসহীন ভূমিকা পালন করছেন। অনলাইনে নামজারি (মিউটেশন) সহজতর করা, ডিসিআর প্রদানে স্বচ্ছতা এবং অবৈধ মাটি ও বাজার মনিটরিং নিয়ে নিয়মিত অভিযান স্থানীয়দের মাঝে আস্থার জায়গা তৈরি করেছে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের অভিযোগ সরাসরি শুনে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে তিনি ‘জনবান্ধব কর্মকর্তা’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।

মৌমিতা গুহ ইভা বলেন, “ভূমি সেবাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াই আমার লক্ষ্য। কোনো মানুষ যেন তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, সেদিকেই আমি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।”
৩. তানিয়া তাবাসসুম: তিনি শুধু একজন কর্মকর্তা নন, তিনি কৃষকের আস্থা, প্রেরণা ও ভরসার আরেক নাম। সাটুরিয়ার সবুজ মাঠ আর সোনালী ফসলের হাসি নিশ্চিত করতে নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তানিয়া তাবাসসুম।

রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি ছুটে যান ফসলের মাঠে—কখনো পোকামাকড় দমনের পরামর্শ দিতে, কখনো বা আধুনিক চাষাবাদের নতুন কৌশল শিখিয়ে দিতে।
কৃষকের সাথে মাটির টানে বসে তিনি খোঁজ নেন তাদের সমস্যার, শোনেন প্রত্যাশা আর সম্ভাবনার কথা। তাঁর আন্তরিকতা ও কর্মদক্ষতায় কৃষকেরা পেয়েছেন নতুন দিশা, নতুন আত্মবিশ্বাস।


বিশেষ করে ড্রাগন ফল ও মাল্টার মতো উচ্চমূল্যের ফসল চাষে তিনি সাটুরিয়ায় যে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছেন, তা আজ জেলার কৃষিক্ষেত্রে এক অনুকরণীয় উদাহরণ। তাঁর উদ্যোগে অনেক কৃষক আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পথে এগিয়ে গেছেন।
পরিবেশ বান্ধব পদ্ধতিতে নিরাপদ সবজি উৎপাদনে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে আসছে। সাটুরিয়া উপজেলায় প্রত্যেকটি বাড়িতে বারোমাসি মরিচ লাগানোর উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। কয়েকটি গ্রামে ইতোমধ্যে মরিচের চারা বিতরণ করা হয়েছে। রাস্তার পাশে অনাবাদি জমিতে মাচায় সবজি চাষ এবং তামাকের পরিবর্তে অন্যান্য লাভজনক ফসল উৎপাদনে কৃষক উঠান বৈঠক ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধকরণের কাজ করে যাচ্ছে।
তানিয়া তাবাসসুম প্রমাণ করেছেন—কৃষি কেবল পুরুষের ক্ষেত্র নয়; নারীর মেধা, সৃজনশীলতা ও নেতৃত্বে কৃষিও হতে পারে আধুনিক, লাভজনক এবং টেকসই শিল্প।
নিজের কাজের অনুপ্রেরণা সম্পর্কে তানিয়া তাবাসসুম বলেন—”কৃষি শুধু ফসলের আবাদ নয়, এটি একটি ভালোবাসা। যখন দেখি একজন কৃষকের মেহনতি মুখে সাফল্যের হাসি ফুটেছে, তখন আমার সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।”
৪. জেসমিন আক্তার: নারীর আত্মনির্ভরতার কারিগর
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার কাজ করছেন সমাজের মূল ভিত্তি নারীদের নিয়ে। অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের কেবল সরকারি ভাতা নয়, বরং তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে তিনি এক নিরলস যোদ্ধা। সেলাই প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে নারীর ক্ষমতায়নে বিভিন্ন আয়বর্ধক মূলক প্রশিক্ষণে —সবখানেই তার ছোঁয়া। বাল্যবিবাহ রোধে তার আপসহীন অবস্থান উপজেলার সামাজিক প্রেক্ষাপট বদলে দিয়েছে। তার মতে, “নারীর হাতে যখন অর্থনৈতিক ক্ষমতা আসে, তখন পুরো পরিবার বদলে যায়।”

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে জেসমিন আক্তার বলেন, “নারীর অধিকার নিশ্চিত করা কোনো করুণা নয়, এটি তাদের প্রাপ্য। সাটুরিয়ার প্রতিটি নারী যেন দক্ষ হয়ে দেশের অর্থনৈতিক মূলধারায় যুক্ত হতে পারে, সেই লক্ষ্যেই আমি কাজ করে যাচ্ছি। ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশে উত্তরণের এই যাত্রায় নারীরাই হবে অগ্রসেনানী।”
সাটুরিয়াবাসীর ভাষ্য:
স্থানীয়দের মতে, আগে সরকারি দপ্তরে গিয়ে সেবা পেতে যে জড়তা কাজ করত, এই চার নারী কর্মকর্তার অমায়িক ব্যবহার ও জনবান্ধব কাজের ফলে তা আজ বিলীন। তারা কেবল দাপ্তরিক প্রধান নন, বরং সাটুরিয়ার সাধারণ মানুষের কাছে হয়ে উঠেছেন ‘মাটি ও মানুষের বন্ধু’।
