নিজস্ব প্রতিবেদক
পবিত্র রমজান মাস, ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা ইফতারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক তখনই মাত্র এক থেকে দুই মিনিটের এক প্রলয়ংকরী তান্ডব লন্ডভন্ড করে দিয়েছিল সাটুরিয়াকে। সেই ভয়াল ২৬ এপ্রিল। ১৯৮৯ সালের এই দিনে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ টর্নেডোর ৩৭ বছর পূর্ণ হলো আজ।
দুই মিনিটে ধ্বংসস্তূপ ১২ গ্রাম
পাহাড়সম মেঘ আর প্রচণ্ড গর্জনে মুহূর্তেই সাটুরিয়া সদর, হাজীপুর, ভাটারা, হরগজ, তিল্লীসহ প্রায় ১২টি গ্রাম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সরকারি-বেসরকারি হিসাব মতে, সেই এক মিনিটের আঘাতেই প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় ১,৩০০ মানুষ। আহত হয়েছিলেন ১২ হাজারের বেশি এবং গৃহহীন হয়েছিলেন প্রায় এক লক্ষ মানুষ। সেদিনের সেই আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছিল সাটুরিয়ার বাতাস।
বেঁচে আছেন ক্ষত নিয়ে
৩৭ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই বিভীষিকা আজও তাড়া করে বেড়ায় বেঁচে থাকা মানুষদের।হরগজ পূর্ব নগর গ্রামের আবুল হোসেন,হরগজ মধ্যকান্দি গ্রামের ইব্রাহিম মাস্টার,হরগজ বাজারের বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা.আব্বাস উদ্দিন জানান,আজও সাটুরিয়ার আকাশে মেঘ জমলে বুক কাঁপে। মানুষের উড়িয়ে নিয়ে দূরে আছাড় দিয়েছিল। উড়ন্ত টিনের আঘাতে পা হারিয়ে আজ তিনি পঙ্গু সাটুরিয়া বাজারের ব্যবসায়ী খসরু হারিয়েছেন তার একটি হাত।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক স্মৃতি আয়েশা (৮০) । তিনি জানান, ছেলের বউ কে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ ঝড়ে ঘরের চালের বাটাম খুলে এসে বৌমা মনোয়ারার পেটে ঢুকে পড়ে।সারারাত বৌমা ওইভাবেই যন্ত্রণায় চিৎকার করছিল । আমরা কেউ সাহস পাচ্ছিলাম না বৌমার বুকে ঢুকে যাওয়া ওই কাঠের (বাটাম) টুকরোটি বের করতে। সকালে ফজল নামের এক প্রতিবেশী বুকে লাথি মেরে ওই কাঠের টুকরো বাহির করে আনামাত্রই বৌমার শরীর থেকে রক্ত বের হতে শুরু করে। এক সময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এমন হাজারো স্বজন হারানোর আর্তনাদ আজও সাটুরিয়ার আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়।এখন বাজারের ব্যবসায়ীরা মেঘ দেখলেই দোকানের সার্টার নামিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছোটেন।
এ বিষয়ে তৎকালীন সাটুরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আ.খ.ম নুরুল হক বলেন, ”আজও আকাশে মেঘ জমলে ভয়ে শরীর শিউরে ওঠে। ঐদিন আমি আমার ভাই কেউ হারিয়েছি সেই ভয়ংকর স্মৃতি ভোলা সম্ভব নয়।”
সাটুরিয়া সদর, হাজীপুর, ভাটারা, হরগজ, তিল্লীসহ প্রায় ১২টি গ্রাম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।এক মিনিটের টর্নেডোর আঘাতেই প্রাণ হারান প্রায় ১,৩০০ মানুষ। আহত হন ১২ হাজারের বেশি এবং গৃহহীন হন প্রায় এক লক্ষ মানুষ।
তাই ২৬ শে এপ্রিল কে টর্নেডো দিবস হিসেবে একটি জাতীয় দিবস ঘোষণার দাবি জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, এই দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠার জন্য তৎকালীন সরকারের একটি ক্যাবিনেট মিটিং হরগজ ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
বর্তমান চিত্র ও কর্মসূচি
তৎকালীন সময়ে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সহায়তায় বড় ধরনের উদ্ধার অভিযান চললেও, ক্ষতিগ্রস্তদের দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন নিয়ে আজও আক্ষেপ রয়েছে স্থানীয়দের মাঝে। অনেকেই নামমাত্র সাহায্য পেলেও জীবনের সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন নিজের শক্তিতেই।
প্রতিবছরের মতো এবারও ২৬ এপ্রিলকে ‘টর্নেডো দিবস’ হিসেবে পালন করছে স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো। দিনটি উপলক্ষে সাটুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন মসজিদে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে।
সাটুরিয়াবাসীর কাছে ২৬ এপ্রিল মানেই এক দুঃসহ যন্ত্রণার নাম, যা চার দশক ছুঁইছুঁই সময়েও ফিকে হয়নি।