সাটুরিয়া (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি:
সাফল্য কোনো ভৌগোলিক সীমানা বা সুযোগ-সুবিধার প্রাচুর্যের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা ধরা দেয় অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম আর লক্ষ্যের প্রতি অবিচল নিষ্ঠার কাছে। গ্রাম থেকেও যে দেশের সর্বোচ্চ শিখরে পা রাখা যায় এবং জাতীয় পর্যায়ে মেধার স্বাক্ষর রাখা যায়, তারই এক অনন্য ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার হরগজ শিমুলীয়া এ আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুই কৃতি শিক্ষার্থী।
একজন প্রতিকূলতা জয় করে ৪৭তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত শামীম খান, আর অন্যজন জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতা-২০২৬-এর বিষয়ভিত্তিক কুইজে (ইংরেজি) জাতীয় পর্যায়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে খুদে শিক্ষার্থী মো. আদিল হোসেন। সে একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মানোয়ার হোসেনের সন্তান।
সবচেয়ে গর্বের বিষয় হলো—এই দুই মেধারই শেকড় জড়িয়ে আছে সাটুরিয়ার ঐতিহ্যবাহী হরগজ শিমুলীয়া এ আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-এর সঙ্গে। একই স্কুল থেকে উঠে আসা দুই প্রজন্মের এই জোড়া সাফল্যে এখন আনন্দ ও গর্বের জোয়ার বইছে পুরো মানিকগঞ্জ জেলা জুড়ে।

পশ্চিম কুষ্টিয়া গ্রামের এক সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম শামীম খানের। বাবা আব্দুল হালিম খান কৃষক এবং মা শামসুন্নাহার বেগম গৃহিনী। সাধারণ পরিবারে বড় হলেও শামীমের স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া। তাঁর শিক্ষাজীবনের গৌরবময় শুরুটা হয়েছিল এই হরগজ শিমুলীয়া এ আলী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই।
এরপর সাটুরিয়া আদর্শ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় (এসএসসি), সাটুরিয়া সৈয়দ কালুশাহ ডিগ্রি কলেজ (এইচএসসি) পেরিয়ে দেশের টেক্সটাইল শিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বুটেক্স থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করেন। ৪৫তম ও ৪৬তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফল না এলেও দমে যাননি তিনি। প্রতিটি ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অবশেষে ৪৭তম বিসিএসে দেশের অন্যতম সেরা ‘প্রশাসন ক্যাডার’ (সহকারী কমিশনার ও ম্যাজিস্ট্রেট) অর্জনের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন—মেধা ও একাগ্রতা থাকলে মফস্বল থেকেও দেশের শীর্ষস্থান দখল করা সম্ভব।
একই স্কুলের নতুন সূর্য: জাতীয় কুইজে দেশসেরা তৃতীয় আদিল
শামীম খান যখন বড়দের মঞ্চে সাটুরিয়ার নাম উজ্জ্বল করছেন, ঠিক তখনই হরগজ শিমুলীয়া এ আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থী আদিল জানান দিল—আগামী দিনের নেতৃত্ব দিতে তারাও প্রস্তুত। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত জাতীয় কুইজ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দেশসেরাদের তালিকায় তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে এই ক্ষুদে বিস্ময় বালক।
শহরের নামী-দামী স্কুল এবং আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা পেছনে ফেলে প্রত্যন্ত গ্রামের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে আদিলের এই জাতীয় স্তরের সাফল্য পুরো মানিকগঞ্জবাসীকে চমকে দিয়েছে। আদিলের এই অর্জন প্রমাণ করে, সঠিক দিকনির্দেশনা ও আত্মবিশ্বাস থাকলে গ্রামীণ প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো থেকেও বিশ্বমানের মেধা গড়ে তোলা সম্ভব।
এ বিষয়ে সাবেক সাটুরিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও হরগজ শিমুলীয়া এ আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আ,খ, ম নুরুল হক বলেন,শামীম ও আদিলের এই অর্জন প্রমাণ করে যে, ইচ্ছা এবং পরিশ্রম থাকলে গ্রামীণ পরিবেশ বা মফস্বল থেকে উঠে এসেও দেশের সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় শীর্ষস্থান দখল করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, মেধার কোনো শহর বা গ্রাম হয় না। আমাদের হরগজ শিমুলীয়া এ আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যে গভীর যত্ন ও নিষ্ঠা দিয়ে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলেন, এই জোড়া সাফল্য তারই এক পরম স্বীকৃতি।
একই প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে আসা শামীম ও আদিলের এই সাফল্য এলাকার তরুণ-তরুণী এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বিশাল বড় অনুপ্রেরণা। এটি মফস্বলের সেই চিরন্তন ধারণাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে যে—বড় কিছু করতে হলে শহরের দামি ব্যাকগ্রাউন্ড দরকার।
সাটুরিয়াবাসীর এখন একটাই প্রত্যাশা—শামীম খান একজন মানবিক ও দক্ষ প্রশাসক হিসেবে দেশ ও দশের সেবা করবেন, আর ক্ষুদে আদিল তার মেধার উজ্জ্বলতা ধরে রেখে আগামী দিনে দেশের মুখ আরও উজ্জ্বল করবে। এই দুই নক্ষত্রের হাত ধরে সাটুরিয়ার ঘরে ঘরে এমন হাজারো শামীম আর আদিল তৈরি হোক—আজকের দিনে এটাই সকলের কামনা।