প্রতিবেদক: সম্প্রতি দেশে ডেঙ্গুর লক্ষণ ও চরিত্রে কিছু পরিবর্তনের কথা শোনা যাচ্ছে। বর্তমানে ডেঙ্গুর ধরন সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
ডা. রাজীব বিশ্বাস: ধন্যবাদ। চিকিৎসায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ডেঙ্গুর ‘প্যাটার্ন’ বদলে যাওয়া। আগে আমাদের একটি ধারণা ছিল—হাঁচি-কাশি বা সর্দি থাকলে ডেঙ্গু হবে না, কিংবা জ্বর আসার ৫-৬ দিন পর রোগীর অবস্থা খারাপ হবে। কিন্তু এখন আর সেই সুযোগ নেই। অনেক ক্ষেত্রে তীব্র জ্বর বা চোখ-কোমর ব্যথার মতো ক্ল্যাসিক্যাল লক্ষণ না-ও থাকতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মাত্র ১ থেকে ২ দিনের মধ্যেই রোগীর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটছে এবং রোগী ক্রিটিক্যাল কন্ডিশনে চলে যাচ্ছে।
প্রতিবেদক: জ্বর অনুভূত হওয়ার প্রথম দিনেই রোগীদের কী করণীয়?
ডা. রাজীব বিশ্বাস: জ্বর হওয়ার প্রথম দিনেই অবহেলা না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। আমরা প্রথম দিনেই তিনটি পরীক্ষা করার পরামর্শ দিচ্ছি:
১. CBC (Complete Blood Count)
২. Dengue NS1
৩. SGOT
মনে রাখতে হবে, প্রথম দিন এনএস১ (NS1) নেগেটিভ আসলেও ডেঙ্গুর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই প্রথম দিনের সিবিসি (CBC) রিপোর্টে থাকা হেমাটোক্রিট (HCT বা PCV) এবং এসজিওটি (SGOT)-এর বেসলাইন মাত্রাটা জেনে রাখা খুব জরুরি, যা পরবর্তীতে রোগীর গাইডলাইন হিসেবে কাজ করে।
প্রতিবেদক: সাধারণ মানুষ প্রায়ই প্লাটিলেট কমে যাওয়া নিয়ে খুব আতঙ্কিত হন। ডেঙ্গুতে রক্তের মূল ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাটি আসলে কোথায়?
ডা. রাজীব বিশ্বাস: প্লাটিলেট গুরুত্বপূর্ণ, তবে প্লাটিলেট কমে যাওয়ার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হলো ‘প্লাজমা লিক’ বা রক্তের ঘনত্ব বেড়ে যাওয়া। প্রতিদিনের সিবিসি পরীক্ষায় আমাদের দেখতে হবে HCT বা হেমাটোক্রিটের মাত্রা কেমন বাড়ছে। যদি দেখা যায় HCT স্বাভাবিক ৩৮%-৪০% থেকে বেড়ে ৪৫% বা ৫০% বা তার বেশি হয়ে গেছে, তবে বুঝতে হবে শরীর থেকে ফ্লুইড লিক হচ্ছে এবং রোগী শকে চলে যাচ্ছে। এটিই ডেঙ্গুর সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থা।
প্রতিবেদক: কোনো রোগী কখন বুঝবেন যে তাঁকে আর বাড়িতে রাখা সম্ভব নয় এবং দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে?
ডা. রাজীব বিশ্বাস: কিছু বিশেষ সতর্কসংকেত বা ‘ডেঞ্জার সাইন’ দেখা দিলে এক মুহূর্ত দেরি না করে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে:
যদি রক্তের হেমাটোক্রিট (HCT) দ্রুত বাড়তে থাকে।
যদি অতিরিক্ত বমি, পেটে তীব্র ব্যথা বা শরীর ফুলতে শুরু করে।
পায়খানা, প্রস্রাব, দাঁতের মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্তপাত শুরু হলে।
রক্তের শ্বেতকণিকা বা WBC Count এবং প্লাটিলেট যদি আশঙ্কাজনকভাবে কমতে থাকে।
প্রতিবেদক: ডেঙ্গু হলে অনেকে না বুঝে নানা রকমের ঔষধ সেবন করেন। এ বিষয়ে আপনার পরামর্শ বা সতর্কতা কী?
ডা. রাজীব বিশ্বাস: চিকিৎসা বিষয়ে বেশ কিছু স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে:
যা করবেন:
জ্বর হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন এবং ডাবের পানি, ওআরএস (ORS) স্যালাইন ও প্রচুর তরল খাবার খান।
ব্যথার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে কেবল ‘প্যারাসিটামল’ খাবেন।
প্রতিদিন নিয়মিত রক্তের সিবিসি (CBC) পরীক্ষা করাবেন।
যা একদম করবেন না:
প্যারাসিটামল ছাড়া কোনো অবস্থাতেই আইবুপ্রোফেন বা অন্যান্য ব্যথানাশক ঔষধ (NSAID) খাবেন না, এতে রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়ে।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক বা স্টেরয়েড সেবন করবেন না।
প্লাটিলেট ২০ হাজারের নিচে না নামলে অহেতুক আতঙ্কিত হয়ে রক্ত বা প্লাটিলেট খোঁজার প্রয়োজন নেই, কারণ এতে হিতে বিপরীত হতে পারে।
প্রতিবেদক: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
ডা. রাজীব বিশ্বাস: ধন্যবাদ। সবাই সচেতন থাকুন ও সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিন।