ঘিওরে ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী “সম্প্রীতির মেলায়” মানুষের ঢল
আব্দুর রাজ্জাক
ঘিওর (মানিকগঞ্জ) :
ধর্মীয় সম্প্রীতির উজ্বল দৃষ্টান্ত মানিকগঞ্জের ঘিওরের সম্প্রীতির মেলা শুরু হয়েছে। প্রায় দু’শ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই মেলায় হাজারো মানুষের আগমন ঘটেছে।
উপজেলার দূর্গা নারায়ণ (ডি.এন) পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে এই মেলার আয়োজন করে উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদ। এই মেলা বিজয়া দশমীর মেলা হিসেবেও পরিচিত। বৃহস্পতিবার বিকেলে শুরু হয় মেলা। চলবে আগামীকাল শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত। বিভিন্ন ধর্মের, বয়সের হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে সম্প্রীতি মেলা পরিণত হয়েছে মিলনমেলায়। এই প্রাণবন্ত আয়োজনে মাটির খেলনা, কাঠের তৈজসপত্র, নাগরদোলা, হরেক রকম মিষ্টিসহ নানান রকমের তিন শতাধিক দোকান বসেছে।
আয়োজকেরা জানান, উপজেলা সদরের সব মণ্ডপের প্রতিমা বিসর্জনের আগে পুরোনো ধলেশ্বরী নদীর পাড়ে স্কুলের মাঠে জড়ো করা হয়। পুরো মাঠ ভরে যায় প্রতিমায়। শেষবারের মতো দুর্গা প্রতিমা দর্শন করতে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ভিড় করেন। বিসর্জনের আগে হিন্দু নারীদের উলুধ্বনি আর কান্নায় চারপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। প্রতিমা বিসর্জনের পর মুহূর্তেই আনন্দ আর গানবাজনার মূর্ছনায় মেতে ওঠেন হাজারো মানুষ। মেলায় অন্য ধর্মের মানুষেরও ঢল নামে।
মেলায় আসা পূজা সাহা ও জয়া সাহা বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমরা বিজয়া দশমীর দিন এই মেলায় আসি। এখানে বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে অনেক আনন্দ হয়। বিসর্জনের আগে শেষবারের মতো অনেক দুর্গা প্রতিমা দর্শন করি।’
স্থানীয় ব্যবসায়ী বিপ্লব কুমার সাহা বলেন, বিজয়া দশমীর দিন সব ধর্মের মানুষ মেলার আনন্দ উপভোগ করতে সমবেত হন এই স্কুলের মাঠে। এখানে বসে হরেক রকম দোকানপাট। বিজয়া দশমীর রাতে একযোগে উপজেলা সদরের সব মণ্ডপের প্রতিমা ধলেশ্বরীর পানিতে বিসর্জন দেওয়া হয়। তখন এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।’
মিষ্টি বিক্রেতা অজিত কুমার ঘোষ বলেন, বিভিন্ন মাপের রসগোল্লা, জিলিপি, আমির্তী ছাড়াও খাজা, গজা, ক্ষীরের চপের মিষ্টি বিক্রি করছি।
বাবার সাথে এই মেলায় মিষ্ট বিক্রি করেছি। বাবা মারা যাবার পর ৩৫ বছর ধরে এখানে আসছি। প্রাচীন এই মেলা যেন মিষ্টি মেলার আসর। এ বার ৭০ হাজার টাকার রসগোল্লা আর জিলাপি বিক্রি করেছি। সব ধর্মের মানুষজন তাদের আত্নীয় বাড়িতে এই মেলার মিষ্টি উপহার দেন।
ঘিওর উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি শচীন্দ্র নাথ মিত্র বলেন,“সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশ। ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো এখানে কোনো বিশেষ ধর্মের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ ও উপস্থিতিতে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে উদযাপিত হয় এই সম্প্রীতির মেলা। প্রায় ২০০ বছর ধরে এখানে বিজয়া দশমীতে এই মেলা বসে আসছে। এ মেলাই আমাদের সম্প্রীতির প্রতীক।”
উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মামুন ভুঁইয়া বলেন, সম্প্রীতির এক উজ্জল স্বাক্ষর এই মেলা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মিলে এক প্রাণে মিশে। এ রেওয়াজ চলে আসছে সুদীর্ঘকাল থেকে। উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের সংগঠনের নেতাকর্মীরা এই সম্প্রীতির মেলায় স্বেচ্ছাশ্রম ও সার্বিক নিরাপত্তায় সহযোগিতা করে আসছে।
ঘিওর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অহিদুল ইসলাম টুটুল জানান,“বহু বছর ধরে এই মেলায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ মিলেমিশে আনন্দে মেতে ওঠে। কোনো বিভেদ কখনোই এই উৎসবের সর্বজনীন পরিবেশ নষ্ট করতে পারেনি।”
ঘিওর থানার ওসি মোহাম্মদ কোহিনূর মিয়া বলেন,“সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে এই মেলা এক অনন্য স্বাক্ষর। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এক প্রাণে মিলিত হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সর্বক্ষণ মাঠে ছিল।”