নিজস্ব প্রতিবেদক,
“কষ্ট কইরা জমিতে ফসল ফলাই, আর সেই ফসল ফলাতে গিয়া সারের দোকানে আইসা হেনস্তা হইতে হয়! সার গুদামে থুইয়া আমাদের ঘুরায়, জোর কইরা দরকার ছাড়া সার গছাইয়া দেয়। সারের চিন্তায় জমির আবাদ কমিয়ে দিছি; কৃষিকাজ ছাইড়া এহন চুরি কইরা খাওয়া ছাড়া আর কোনো গতি নাই!”
চোখে জল আর বুকে জমানো তীব্র ক্ষোভ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষক আছলাম। হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে যারা দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ রাখেন, মানিকগঞ্জ সদরের সারের দোকানগুলোতে এখন সেই কৃষকদের তীব্র হাহাকার ও নীরব কান্না বাতাসে ভাসছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সার-বীজ বিপণন কর্মসূচিতে কৃষকদের জিম্মি করে পকেট কাটার এক নির্মম অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ডিলার ও কৃষি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
ট্যাগ করে অতিরিক্ত সার বিক্রির কারসাজি:
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো কৃষককে তাঁর চাহিদার বাইরে অপ্রয়োজনীয় সার নিতে বাধ্য করা সম্পূর্ণ বেআইনি। কিন্তু মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার বাসস্ট্যান্ড এলাকার জেল গেটের বিপরীতে ‘মেসার্স ইউনিক এন্টারপ্রাইজ’ নামের এক ডিলারের দোকানে সরেজমিনে গিয়ে দেখা মেলে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। সেখানে উপস্থিত থেকে খোদ উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের অপ্রয়োজনীয় সার কিনতে বাধ্য করছেন।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী নারী কৃষক নার্গিস আক্তার জানান, তাঁর ঘরে আগে থেকেই পটাশ সার কেনা থাকায় তিনি কেবল ডিএপি (DAP) সার চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়, ২ বস্তা ডিএপির সাথে বাড়তি ১ বস্তা পটাশ না নিলে কোনো সারই দেওয়া হবে না। তিনি চোখের জল মুছতে মুছতে বলেন, “তারা আমাকে জোর করে হাজার টাকার উপরে বাড়তি পটাশ নিতে বাধ্য করল।
একই পরিস্থিতির শিকার কৃষক মতিয়ার রহমান ও শাহিন অভিযোগ করে বলেন, সার চাইলে বলে নাই, অথচ গোপনে ঠিকই বেশি দামে বিক্রি করে দিচ্ছে। আর দোকানে এলে বলে—পটাশ না নিলে সার পাবা না। আমরা এত অতিরিক্ত টাকা পাব কোথায়?
ডিলারের লাভের সাফাই কৃষি কর্মকর্তার মুখে:
অনিয়মের বিষয়ে দোকানের ডিলার প্রতিনিধি কোহিনুর আলম জানান, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ীই তারা সার বিক্রি করছেন।
তবে ঘটনার সময় উপস্থিত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা কল্পনা আক্তারের বক্তব্য উপস্থিত সবাইকে হতবাক করে দেয়। তিনি নির্দ্বিধায় ডিলারের ব্যবসার সাফাই গেয়ে বলেন, কৃষকরা শুধু ডিএপি চায়, কিন্তু দোকানদারের ঘরে তো পটাশ জমে থাকে। দোকানদার পটাশ বিক্রি করবে কীভাবে? সবাই যদি শুধু ডিএপি চায়, তাহলে ডিলারের কী হবে?
যে কর্মকর্তার দায়িত্ব কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করা, তিনি নিজেই ডিলারের অবিক্রীত সার গছিয়ে দিতে কৃষকের পকেট কাটায় সহায়তা করছেন—এমন চিত্রে ক্ষুব্ধ স্থানীয় সচেতন মহল।
প্রশাসনের কঠোর হুশিয়ারি:
বিষয়টি নিয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহজাহান সিরাজ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কোনো ডিলার কৃষকের ওপর অপ্রয়োজনীয় সার চাপিয়ে দিলে তা নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। মানিকগঞ্জে সারের কোনো সংকট নেই। এ ধরনের অসাধু কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অতি দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, আমরা বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করব। সারের সাথে কৃষকের রুটিরুজি জড়িত। সার নিয়ে কোনো অরাজকতা সহ্য করা হবে না। দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
প্রান্তিক কৃষকদের এই কৃত্রিম জিম্মিদশা ও ডিলার-কৃষি কর্মকর্তা সিন্ডিকেটের অসাধু তৎপরতা বন্ধে প্রশাসনের দ্রুত ও দৃশ্যমান হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী চাষিরা।