নিজস্ব প্রতিবেদক, রূপকথা টিভি
দেশের একমাত্র বিশেষায়িত মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্র পাবনা মানসিক হাসপাতাল। প্রতিষ্ঠার সাড়ে ছয় দশক পেরিয়ে গেলেও সুচিকিৎসার আধুনিকায়ন ও প্রশাসনিক দক্ষতায় এখনও রয়ে গেছে নানা ঘাটতি। ১৬ অক্টোবর (শুক্রবার) ছুটির দিনে দুপুরে সরেজমিনে পরিদর্শনে উঠে এসেছে হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার নানা চিত্র, প্রশাসনিক ঢিলেঢালা ভাব এবং সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের ভোগান্তির বাস্তব চিত্র।
আকস্মিক পরিদর্শন ও বর্তমান চিত্র
শুক্রবার দুপুরের দিকে হাসপাতাল চত্বর ও এর ওয়ার্ডগুলো সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় বহির্বিভাগ (আউটডোর) ও প্রশাসনিক কার্যালয় সম্পূর্ণ বন্ধ। কেবল জরুরি বিভাগ ও ভর্তি রোগীদের ওয়ার্ডগুলো চালু রয়েছে। তবে বহির্বিভাগ বন্ধ থাকলেও দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা সঠিক তথ্যের অভাবে চত্বরে ভিড় করছেন। ছুটির দিনের সুযোগে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে বহিরাগত ও দালালদের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। নিরাপত্তার ঘাটতি ও তথ্যকেন্দ্র সচল না থাকায় চরম বিভ্রান্তিতে পড়ছেন সেবাপ্রার্থীরা।

যোগাযোগের চেষ্টা ও প্রশাসনিক স্থবিরতা
হাসপাতালের সার্বিক প্রশাসনিক তদারকি ও জরুরি ব্যবস্থাপনা জানতে দুপুরের দিকে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কার্যালয়ে যাওয়া হয়। তবে ছুটির দিন হওয়ায় তার দেখা মেলেনি। পরবর্তীতে তার সরকারি ও ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি কিংবা কোনো সাড়া মেলেনি। প্রশাসনিক প্রধানের এমন অনুপস্থিতি ও যোগাযোগহীনতার কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ সেবাগ্রহীতাদের।
চিকিৎসা সেবার সার্বিক চ্যালেঞ্জ
স্থানীয় বাসিন্দা ও চিকিৎসাধীন রোগীদের স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বিশেষায়িত এই হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার প্রধান সমস্যাগুলো হলো:
জনবল ও চিকিৎসক সংকট: অনুমোদিত পদের বিপরীতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ চিকিৎসকের পদ ফাঁকা। ফলে ভর্তি রোগীরা প্রয়োজনীয় নিবিড় পর্যবেক্ষণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
ওষুধ ও আবাসন সীমাবদ্ধতা: সরকারিভাবে বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহের নিয়ম থাকলেও অনেক সময় রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে। এছাড়া শয্যাসংখ্যার তুলনায় রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় আবাসন ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাও নাজুক।
তদারকির অভাব: বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে জরুরি বিভাগে চিকিৎসকদের অবস্থান এবং কর্মীদের দায়িত্ব পালনে শিথিলতা দেখা যায়।
স্বজনদের আক্ষেপ ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের দাবি
পাবনার ঈশ্বরদী থেকে আসা এক রোগীর স্বজন আক্ষেপ করে বলেন, “জরুরি প্রয়োজনে রোগীকে নিয়ে এসেছি, কিন্তু ছুটির দিন হওয়ায় সঠিক দিকনির্দেশনা পাব বা দায়িত্বশীল কাউকে পাব—সেই উপায় নেই। প্রশাসনিক তদারকি না থাকলে সাধারণ মানুষের কষ্ট কেউ দেখে না।”
তবে ওয়ার্ডে কর্মরত একাধিক নার্স ও সেবাকর্মীর দাবি, প্রশাসনিক কর্মকর্তা সরাসরি উপস্থিত না থাকলেও রোগীদের দৈনিক খাবার সরবরাহ, রুটিন ওষুধ প্রদান এবং জরুরি সেবা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
করণীয় ও সুনির্দিষ্ট সুপারিশ
১. ২৪/৭ প্রশাসনিক তদারকি: ছুটির দিন হলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা বিকল্প সমন্বয়কারীর সার্বক্ষণিক উপস্থিতি ও মোবাইল যোগাযোগ সচল রাখা জরুরি।
২. তথ্যকেন্দ্র ও নিরাপত্তা জোরদার: ছুটির দিনে বহিরাগতদের প্রবেশ ঠেকাতে নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং সেবাপ্রার্থীদের জন্য একটি সচল তথ্য বুথ চালু করা প্রয়োজন।
৩. জরুরি বিভাগে চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানো: ছুটির দিনে রোগীর চাপ সামলাতে জরুরি বিভাগে অতিরিক্ত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োজিত করা।
উপসংহার
পাবনা মানসিক হাসপাতাল কেবল একটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি দেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রধান ভরসাস্থল। প্রশাসনিক গতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং ছুটির দিনেও চিকিৎসাসেবার মান বজায় রাখার মাধ্যমে এই হাসপাতালের সুনাম পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। এ বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছেন সেবাপ্রার্থী ও স্থানীয় সচেতন মহল।